বছর ঘুরে ইদ আসে, আব্বু আর আসে না...........
ঢাকা ছেড়ে এসেছি আজ পাঁচ দিন হলো। প্রথমে ছিলাম ঝিনাইদহে, তারপর গতকাল এসে উঠেছি মাগুরার এক ডাকবাংলোয়।
ইচ্ছে ছিল, আজ সকালে উঠেই শহরের বিভিন্ন জায়গা পর্যবেক্ষণ করবো। কিন্তু ভোর থেকেই শুরু হলো এক বিরামহীন বৃষ্টি যেন আকাশের হৃদয় আজ ফেটে গেছে, যেন সব জমা বেদনা নিয়ে মেঘেরা কাঁদছে।
দশটার দিকে বৃষ্টি একটু থামল। তাড়াহুড়া করে রেডি হয়ে মামুন ভাই ও মাহফুজ ভাইকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। শহরের পল্লীবিদ্যুৎ এলাকা ঘুরে পৌঁছালাম পারনানদুয়ালি এলাকায়।
ঠিক তখনই আবার শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। চারপাশে কোথাও দাড়ানোর জায়গা নেই। বাধ্য হয়ে একটি বাড়ির গেটে কড়া নাড়লাম। ভেতরে ডুকে মনে হলো এটাকে "বাড়ি" বলা অন্যায় হবে। যেন স্বর্গের এক টুকরো নেমে এসেছে মাগুরার বুকে। আধুনিক নকশা, চারপাশে বাহারি ফুলের সারি, কচি পাতার মধ্যে ঝরে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা। গাছগুলো যেন আনন্দে দুলছে।
আমি তখন শুধু ভাবছিলাম Arifa Tabassum Anika আপু আর Mehruba Sharmin আপুর কথা। গাছের প্রতি তাদের ভালোবাসা এত গভীর যে, নিজের বাসা তো আছেই, অফিস ঘরকেও তারা গাছ দিয়ে এক ছোট্ট বাগান করে তোলার পরিকল্পনা করছে। তারা যদি আজ এখানে থাকতেন, নিশ্চয়ই প্রতিটি গাছের নাম বলে দিতে পারতেন। আর যদি কোনও একটা গাছ চিনতে না পারতেন বা তাদের কাছে না থাকতো, তাহলে হয়তো বলেই ফেলতো, এই গাছটা কি আমাকে দেওয়া যাবে? না দিলে হয়তো ডাল ভেঙে চুরি করে নিয়ে আসার প্ল্যান করতো নিশ্চয়ই।
যাই হোক, আমরা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম বৃষ্টির থামার। কিন্তু বৃষ্টি যে আজ ছুটি নিয়ে বেরিয়েছে, তাই ফিরে যাওয়ার নাম নেই। এই অপেক্ষার মাঝে হঠাৎ এক ছোট্ট ছেলের কণ্ঠ কানে এলো, "আঙ্কেল, তোমরা কি বিদেশ থেকে এসেছো? "আমার আব্বুও বিদেশ থাকে, তুমি কি চেনো তাকে?" আব্বু কি ইদে বাড়িতে আসবে??
হেসে বললাম, হুম চিনি, এই তো কয়েকদিন পর আসবে।
ছেলেটি মাথা নাড়িয়ে বলল, "আমি জানি, আব্বু আসবে না..."
শব্দগুলো যেন আমার কানে বারবার বাজতে লাগলো। পাশে দাঁড়ানো এক বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলাম, "বাচ্চাটি এ কথা বলছে কেন?"
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
"ওর বাবা বিদেশে থাকে। যখন ও ওর মা'র গর্ভে, তখনই সে ইতালিতে গেছে, তারপর চার বছর হয়ে গেছে, এখনও আসার সুযোগ হয় নি।
আমি বিস্ময়ে বললাম, "একবারও না?"
তিনি বললেন,
"আসার সামর্থ্য কই বাবা? এই বাড়িটা করার জন্য অনেক ঋণ নিয়েছে, এখনও শোধ হয়নি। তাছাড়া এখনও বৈধ কাগজ হয় নি, কাগজ না হলে দেশে আসবে কিভাবে?"
আমি আর কোনও উত্তর খুঁজে পেলাম না। শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। ভাবছিলাম যে মানুষটা ঘাম ঝরিয়ে প্রবাসে কাজ করে এই রাজপ্রাসাদ বানিয়েছে, তার নিজের ঠাঁই নেই সেই বাড়ির একটুকুও কোণে। হয়তো সে পড়ে থাকে কোনও এক পরিত্যক্ত ব্যাচেলর বাসায়, যেখানে সন্ধ্যায় আলো জ্বলে না, সঙ্গী শুধু একটা বিছানা আর নিঃসঙ্গতা।
আর এই প্রান্তে, তার সন্তান জানালার ধারে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন দেখে আকাশের পথ এই বুঝি বাবা ফিরবে.........
দিন শেষে একটাই কথা "বছর ঘুরে ইদ আসে, আব্বু আর আসে না"..........
Md. Mujammel Haque
Subscribe to:
Post Comments
(
Atom
)
Best wishes for every fighter
ReplyDelete