যদি পৃথিবী থেকে মশাকে নির্মূল করা হয় তাহলে কি ঘটবে?
আপনি হয়তো জেনে অবাক হবেন, মশার প্রধান খাবার মোটেও রক্ত নয়। প্রকৃতপক্ষে, মশা তাদের দৈনন্দিন শক্তির চাহিদা পূরণ করে ফলের রস, পাতার রস এবং ফুলের নির্যাস খেয়ে। শুধু মাত্র পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী মশা প্রজননের জন্য রক্ত পান করে। কারণ রক্তে বিদ্যমান প্রোটিন ও আয়রন তার ডিম উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য উপাদান। বাংলাদেশের প্রায় ১২৬ প্রজাতির মশার মধ্যে সবগুলোই যে মানুষকে কামড়ায়, তা নয়।
কিছু মশা মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়, এদের বলা হয় anthropophilic। আবার কিছু মশা শুধুমাত্র পশুপাখি কিংবা অন্যান্য প্রাণীকে কামড়ায়, এদের বলা হয় zoophilic। তাছাড়া অসংখ্য প্রজাতি রয়েছে যারা রক্ত খায় না, তারা উদ্ভিদের রসে বেঁচে থাকে। আর যেসব মশা রক্ত খায়, তাদের মধ্যেও কেবল অল্প কয়েকটি প্রজাতি সত্যিকারের রোগবাহক—যারা মানুষের শরীর থেকে ভাইরাস বা পরজীবী অন্য কারও শরীরে স্থানান্তর করে থাকে।
এখন প্রশ্ন জাগতে পারে—যদি আমরা পৃথিবী থেকে মশাকে সম্পূর্ণ নির্মূল করে ফেলি, তাহলে কী হবে? উত্তর হলো—পৃথিবী থেকে কোনো প্রজাতিকে একেবারে নির্মূল করা সম্ভব নয়, আর তা হলে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটবে। কারণ প্রতিটি প্রাণীই একটি food web-এর অংশ, যেখানে একটির উপর নির্ভর করে অন্যটির টিকে থাকা। মশা হলো বহু প্রাণীর খাদ্য—মাছ, ব্যাঙ, টিকটিকি, বাদুড়, এমনকি কিছু প্রজাতির পাখি সরাসরি মশার উপর নির্ভরশীল। মশা হঠাৎ বিলুপ্ত হলে সেই খাদ্যচক্র ভেঙে পড়বে, যা প্রকৃতির ভারসাম্যে বিপুল ক্ষতি ডেকে আনবে।
তবে এর মানে এই নয় যে আমরা অসহায়। মশাকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব না হলেও কার্যকর ব্যবস্থাপনা (mosquito management) এর মাধ্যমে তাদের ক্ষতিকর প্রভাব কমানো যায়। উদাহরণস্বরূপ, জেনেটিক মডিফিকেশন, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ (biocontrol), পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদ বায়ো-ইনসেক্টিসাইড ব্যবহার করে মশাকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় যাতে তারা আর রোগ বহন করতে না পারে।
মশা আমাদের কাছে বিরক্তির নাম হলেও, তারা প্রকৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মনে রাখতে হবে—প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীই একে অপরের সঙ্গে জড়িত; তাই মশার ক্ষেত্রেও আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত “ধ্বংস নয়, নিয়ন্ত্রণ"।
মোঃ মোজাম্মেল হক
কীটতত্ত্ববিদ

No comments